স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল ওয়ান। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভুয়া কপিরাইট দাবি (ফলস কপিরাইট ক্লেইম) এবং সংঘবদ্ধভাবে রিপোর্ট করার মাধ্যমে পরিকল্পিত সাইবার আক্রমণ চালিয়ে তাদের ফেসবুক পেজের কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
প্রকাশের এক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিও ‘ব্লক’
চ্যানেল ওয়ান জানায়, গত শুক্রবার রাতে তাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে ‘প্রতিমন্ত্রী যখন সরকারি ঠিকাদার!’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভিডিওটি প্রকাশের প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি ব্লক হয়ে যায়।
শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে চ্যানেল ওয়ান জানায়, প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই ‘আনন্দবার্তা’ এবং ‘আলি খান’ নামে দুটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটির মালিকানা দাবি করে কপিরাইট ক্লেইম করে। এর পাশাপাশি সারা রাতজুড়ে বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তাদের বিভিন্ন কনটেন্টে সংঘবদ্ধভাবে রিপোর্ট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
‘পেজ বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র’
চ্যানেল ওয়ান কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এর পেছনে একটি ‘বড় ষড়যন্ত্র’ রয়েছে। তাদের ভাষ্য, উদ্দেশ্য ছিল চ্যানেল ওয়ানের ফেসবুক পেজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনামূলক বা তাঁর বিপক্ষে যায়—এমন নতুন কোনো পোস্ট প্রকাশের পরই তাতে সংঘবদ্ধভাবে রিপোর্ট করা হচ্ছে।
এছাড়া ভুয়া কপিরাইট দাবির কারণে তাদের আরও কয়েকটি পোস্ট ও ফটোকার্ডেও কপিরাইট স্ট্রাইক পড়েছে বলে জানানো হয়।
চ্যানেলটির মাল্টিমিডিয়া বিভাগের দাবি, এসব ঘটনার ফলে তাদের ফেসবুক পেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
‘গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা’
চ্যানেল ওয়ানের এডিটর ইন চিফ নাজমুল আশরাফ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সাংবাদিকতার প্রচলিত নীতি ও পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তার প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা বা আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সে পথে না গিয়ে সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য মেলেনি
চ্যানেল ওয়ানের অভিযোগে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ইঙ্গিত করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রথম আলোর তথ্যমতে, প্রতিমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কী ছিল অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে
চ্যানেল ওয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তিনি নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সরকারি ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিবেদনে আইনবিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এমন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এছাড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের কাজ বরাদ্দ হয়েছে।
ছেলের নামে কোটি টাকার কাজ পাওয়ার দাবি
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাখরুল আলম সীমান্তের নামে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রায় ১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ছয়টি প্রকল্পের কাজ নেওয়া হয়েছে।
ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা (ই-জিপি) থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাওয়া কাজের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি একমাত্র দরদাতা ছিল।
শেয়ার হস্তান্তর ও বিসিকের কাজ নিয়ে অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা বললেও সরকারি কাজ পাওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী তাঁর প্রতিষ্ঠানের শেয়ার স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেন।
এ ছাড়া তাঁর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর মাধ্যমে পটাশিয়াম আয়োডাইড সরবরাহের কাজ করে আসছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো জানা যায়নি
চ্যানেল ওয়ানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখিত দাবিগুলোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, চ্যানেল ওয়ান দাবি করছে, তাদের প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে ভুয়া কপিরাইট দাবি এবং সংঘবদ্ধ অনলাইন রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের অবস্থান সামনে এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।