ঢাকা

চাঁদাবাজদের ‘ভিক্ষা’ দিতে দানবাক্স বসানোর কথা বললেন হাসনাত-পাটওয়ারী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে প্রতীকী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁদের ভাষ্য, চাঁদাবাজদের চাঁদা না দিয়ে প্রতীকীভাবে ‘ভিক্ষা’ দেওয়ার জন্য এসব বাক্স ব্যবহার করা হবে। বাক্সে জমা অর্থ চাঁদাবাজদের ‘পুনর্বাসনে’ কাজে লাগানোর কথা বলেন তাঁরা।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটর-হাতিরপুল এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহর উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রতীকী কর্মসূচিতে দুটি ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ প্রদর্শন করা হয়। বাক্স দুটির গায়ে চাঁদাবাজির বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবি দিয়ে লেখা ছিল—‘চাঁদাবাজদের মবতন্ত্র!’ এবং ‘চান্দা ভাইকে চাঁদা নয়, ভিক্ষা দিন’।

কর্মসূচি থেকে এনসিপির নেতারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এ ধরনের প্রতীকী দানবাক্স স্থাপনের আহ্বান জানান। তাঁদের বক্তব্য, চাঁদাবাজদের চাঁদা দেওয়ার পরিবর্তে ‘ভিক্ষা’ দেওয়ার প্রতীকী উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

স্লোগানে শুরু কর্মসূচি

বাংলামোটরের রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারের নিচে কর্মসূচি শুরু হয়। শুরুতে এনসিপির নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা ‘ভিক্ষা লাগলে ভিক্ষা নে, জনগণকে মুক্তি দে’, ‘বিএনপির চাঁদাবাজি, চলবে না চলবে না’, ‘চাঁদাবাজির বাংলাদেশ, ফিরবে না ফিরবে না’ এবং ‘নো টেইক ব্যাক বাংলাদেশ, ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ’—এ ধরনের স্লোগান দেন।

একপর্যায়ে প্রতীকী দানবাক্স হাতে নিয়ে বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি দাবি করেন, মাছবাজার, কাঁচাবাজার, হাসপাতাল, পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পেশার মানুষের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চরের মধ্যে গরুকে ঘাস খাওয়াতেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বাড়িঘর ও মাদ্রাসা দখলের পাশাপাশি রাজধানীতে দিনের বেলাতেও অস্ত্র নিয়ে দখল ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।

তবে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য বা পৃথক মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেননি।

‘চাঁদা নয়, ভিক্ষা দিন’

চাঁদাবাজি থেকে মানুষ মুক্তি চায় উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশের প্রতিটি মোড় ও এলাকায় চাঁদাবাজদের জন্য প্রতীকীভাবে দানবাক্স স্থাপন করা যেতে পারে। মানুষকে সেখানে ৫ বা ১০ টাকা করে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিবর্তে কেউ যদি অর্থ চায়, তাহলে ওই দানবাক্স থেকে তা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে চাঁদাবাজদের জন্য একটি বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

হাসনাত বলেন, ‘বিএনপির যেসব চাঁদাবাজ নেতা-কর্মী আছেন, আপনারা এই দানবাক্স থেকে টাকা নিয়ে যাবেন, তবু আমাদের বাড়িঘর-হাসপাতাল ভাঙার দরকার নেই।’

তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজির কারণে যেন মানুষের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য স্থাপনায় হামলা না হয়, সে জন্য প্রতীকী দানবাক্সের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এর মাধ্যমে চাঁদাবাজদের ‘কর্মসংস্থানের’ একটি ব্যবস্থা করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন’

চাঁদাবাজদের উদ্দেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তাঁরা অন্তত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। তিনি বলেন, মানুষ চাঁদাবাজির অর্থ দিতে চায় না; তবে চাঁদা আদায়ের নামে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুরও যেন না হয়।

তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাড়িঘর ও মাদ্রাসা দখলের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে এসব ঘটনা থেকে মানুষ মুক্তি চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় ‘চাঁদাবাজ পুনর্বাসন দানবাক্স’ গড়ে তোলার মাধ্যমে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে চান তাঁরা। তাঁর মতে, দানবাক্স থেকে অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে চাঁদাবাজদের পুনর্বাসনের একটি প্রতীকী ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তারা মানুষের সম্পদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা না চালায়।

পাটওয়ারীর নেতৃত্বে স্লোগান

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নেতা-কর্মীদের নিয়ে স্লোগান দেন। এ সময় ‘চাঁদাবাজের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ এবং ‘চাঁদাবাজের কফিনে, পেরেক মারো একসাথে’—এ ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়।

এরপর প্রতীকী দানবাক্স নিয়ে মিছিল বের করেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি বাংলামোটর ও হাতিরপুল এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলটির নেতারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন।

মিছিলটি হাতিরপুলের মোতালিব প্লাজার সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে মার্কেটটির সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা।

ব্যবসায়ীদের দোকানে দানবাক্স রাখার আহ্বান

মোতালিব প্লাজার সামনে বক্তব্য দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি প্রতিটি দোকানে একটি করে বাক্স রাখার আহ্বান জানান। কোনো ব্যক্তি চাঁদা চাইতে এলে চাঁদার পরিবর্তে ওই বাক্স থেকে অর্থ নেওয়ার কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

পাটওয়ারী বলেন, ব্যবসায়ীরা যেন চাঁদাবাজির অর্থ না দেন এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নেন। তাঁর বক্তব্যে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানও উঠে আসে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমরা জিহাদ ঘোষণা করলাম, এটা আমরা চলতে দেব না।’

এ বক্তব্যের মাধ্যমে পাটওয়ারী চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এনসিপির অবস্থান তুলে ধরেন এবং ব্যবসায়ীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের আদায় বন্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

‘মোড়ে মোড়ে ভিক্ষার বাক্স রাখুন’

কর্মসূচির সমাপনী বক্তব্যে আবারও প্রতীকী দানবাক্স স্থাপনের আহ্বান জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, মানুষের নিরাপত্তার জন্য দেশের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ও দোকানপাটের সামনে এ ধরনের দানবাক্স বা ‘ভিক্ষার বাক্স’ রাখা যেতে পারে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ চাঁদা চাইতে এলে তাকে চাঁদার অর্থ না দিয়ে ওই বাক্স থেকে অর্থ নেওয়ার কথা বলা হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদাবাজির চাপ কমানোর পাশাপাশি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

হাসনাত বলেন, ‘তোমাদের জন্য ভিক্ষার বাক্স রাখা আছে, ওখান থেকে তোমরা নিয়ে যাও, তাও আমাদের বাঁচতে দাও।’

তিনি চাঁদাবাজি বন্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

কর্মসূচিতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এনসিপির নেতাদের বক্তব্যে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি প্রতীকী দানবাক্স স্থাপনের ধারণাটি তুলে ধরা হয়। দলটির নেতারা মনে করেন, চাঁদা না দিয়ে প্রকাশ্যভাবে এর প্রতিবাদ এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা সম্ভব।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স